رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোর গল্প
সাম্পান নৌকা, কুরআনের বাণী আর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যে গড়া এক প্রতীকের ইতিহাস
ভূমিকা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) লোগোর দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে ওপরের দিকে দুই পাশে বেঁকে ওঠা কালো কাঠামো। অনেকে প্রথম দেখায় একে কুলার মতো মনে করেন। আসলে এর আকৃতি এসেছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী নৌকা সাম্পান থেকে। লোগোর ভেতরে আছে কুরআনের একটি দোয়া, একটি খোলা বই এবং একটি পরমাণুর চিহ্ন। এই লেখায় লোগোর গঠন, সাম্পানের ইতিহাস এবং কোন তথ্য কতটা যাচাই করা গেছে, সবই এক জায়গায় তুলে ধরা হলো।
সাম্পান থেকে লোগো
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, চবির মনোগ্রামের মূল আকৃতি পেছন থেকে দেখা সাম্পানের আদলে আঁকা। সাম্পানের পেছনের অংশে দুটি গলুই থাকে, যা মোষের শিংয়ের মতো দুই ভাগে বিভক্ত। লোগোর ওপরের দুই বাঁকানো অংশ সেই গঠনকেই মনে করিয়ে দেয়। দৈনিক আজাদীর একটি লেখায়ও বলা হয়েছে, সাম্পানের পেছনের গলুইয়ের অংশ নিয়ে লোগোটি গঠিত।
সাম্পান কী?
সাম্পান কাঠের তৈরি চওড়া তলার একটি নৌকা। এর কাঠামো বাঁকানো কিলের ওপর গড়া এবং সামনের দিকটা তীক্ষ্ণভাবে ওপরে ওঠা। চট্টগ্রামে এটি কর্ণফুলী, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীতে বহু শতাব্দী ধরে চলে আসছে।
নামের উৎস
বলা হয়, শব্দটি চীনা "সাং পাং" থেকে এসেছে, যার অর্থ "তিন মাথা"। সাম্পানের গলুই তিনটি: সামনে একটি, পেছনে দুটি।
গঠন
পেছনের দুই গলুই শিংয়ের মতো বাঁকানো। একটি মাস্তুল থাকে, যাতে পাল খাটানো হয়। কখনো ছোট তিনকোণা অতিরিক্ত পালও ব্যবহার হয়।
কাঠ
পিতরাজ, গামারি, জাম, গর্জন, ফুলকরই ও হিনিয়ারি কাঠে তৈরি হয়। টেকনাফ ও আরাকানের সাম্পান বেশির ভাগ সেগুন কাঠের।
আকার
ছোট সাম্পান ৩.৬৬ থেকে ৪.২৭ মিটার লম্বা। বড়টি ৮.৫৩ থেকে ৯.১৪ মিটার, যাতে ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী বা ১২০ মণ মালামাল বহন করা যেত।
এক কারিগরের মতে, আদর্শ সাম্পান হয় প্রায় ৬.০৯ মিটার লম্বা, ১.৬১ মিটার চওড়া ও ০.৮৫ মিটার উঁচু। চট্টগ্রামে একটি পুরোনো প্রবাদ আছে, "সাম্পান, শুঁটকি, দরগা, এ নিয়ে চাটগাঁ"।
"ক্যাঁ কোরত" শব্দটি কীসের?
সাম্পান কোথায় তৈরি হতো?
সাম্পান নিয়ে লোকসংস্কৃতি
লোগোর উপাদান ও অর্থ
| উপাদান | সাধারণ ব্যাখ্যা | অবস্থা |
|---|---|---|
| বাঁকানো কালো কাঠামো | সাম্পান নৌকার গঠন, চট্টগ্রামের ঐতিহ্য | একাধিক সূত্রে নিশ্চিত |
| আরবি লেখা "রব্বি জিদনি ইলমা" | "হে আমার প্রভু, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন" (সূরা ত্ব-হা, ২০:১১৪) | লেখা থেকেই স্পষ্ট |
| খোলা বই | জ্ঞান, শিক্ষা ও বিদ্যাচর্চা | প্রচলিত ব্যাখ্যা |
| পরমাণুর চিহ্ন | বিজ্ঞান, চিন্তা ও গবেষণা | প্রচলিত ব্যাখ্যা |
| নিচের ত্রিকোণ আকৃতি | অনেকে পাহাড়ের প্রতীক বলেন | অফিসিয়াল সূত্র পাওয়া যায়নি |
| নিচের সাদা আকৃতি | অনেকে সাগরের ঢেউয়ের প্রতীক বলেন | অফিসিয়াল সূত্র পাওয়া যায়নি |
লোগোর নকশাকার কে?
দৈনিক পূর্বকোণের একটি ফিচারে বলা হয়েছে, লোগোটি তৈরি করেছেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার নকশাকার, বিখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
আরও কিছু আকর্ষণীয় তথ্য
বিমানবন্দরে সাম্পান
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ভাস্কর নিতুন কুণ্ডু ২০০১ সালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে সাম্পানের প্রতীক নির্মাণ করেন।
অন্য প্রতিষ্ঠানেও সাম্পান
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক একাডেমি ও চাটগাঁ ভাষা পরিষদের মনোগ্রামেও সাম্পানের আদল ব্যবহৃত হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
অধরা ঐতিহ্য
বাংলাদেশের ঐতিহ্য তথ্যভান্ডারে সাম্পান নির্মাণের কৌশল "ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প" হিসেবে তালিকাভুক্ত।
সাম্পান এখন কেমন আছে?
কয়েক দশক আগেও কর্ণফুলীর চাক্তাই-রাজাখালী এলাকার ঘাট থেকে বিভিন্ন উপজেলার যাত্রী ও পণ্য সাম্পানে যাতায়াত করত। এখন সেতু, সড়ক ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার কারণে সাম্পানের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। তবু চবির লোগো, গান, সাহিত্য ও লোকজ স্মৃতিতে সাম্পান চট্টগ্রামের পরিচয়ের অংশ হয়েই আছে।
প্রশ্নোত্তর
লোগোর আরবি লেখাটি কোন সূরার?
লোগোটি কি আসলে কুলার আকৃতির?
পাহাড় ও সাগরের প্রতীকের কথা কি সত্য?
- নিশ্চিত: সাম্পান থেকে আকৃতি, আরবি বাণী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার তথ্য।
- একটি সূত্রে পাওয়া: নকশাকার কামরুল হাসান।
- অযাচাইকৃত: পাহাড়, ঢেউ, বই ও পরমাণুর প্রতীকী অর্থ।
